আজরাইলের থাবা

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ (মে ২০২৬)

সালাহ উদ্দিন শুভ
  • 0
  • ৪৩
নিলু, জানো,
এখানে ভোর আসে না, শুধু লাল আলোর রোদ।
আকাশটা প্রতিদিন নতুন করে আত্মহত্যা করে,
তার রক্ত নেমে আসে জমিনের শরীরে,
আর মাটি সেই রক্ত খেয়ে নিঃশব্দে ফুলে ওঠে।

এখন আর জমিনে হাঁটি না,
মানুষের লাশের উপর হাঁটি।
পায়ের নিচে কারো পাঁজর ভাঙার শব্দ পাই,
তবু থামি না।

থামলে মনে পড়ে,
আমি এখনো বেঁচে আছি।

চোখ বন্ধ করলেই একটা মেয়ের মুখ ভাসে।
না, মুখ না ঠিক,
অর্ধেক মুখ, আর অর্ধেক ঝলসানো মাংস।

তার মায়াবী এক চোখ আমায় চেয়ে রয়,
এক চোখে দেখি জান্নাত, আর অন্যটায় ভয়।

চোখ খুললেও দেখি সে তেমনই থাকে
অসহ্য এক দৃষ্টিতে আমায় চেয়ে দেখে।

মনে হয়,
সে মরেনি।

সে বের হতে পারেনি।
আমার মাঝেই আটকে গেছে।

নিলু,
আমি এখন মাঝে মাঝে ভয় পাই,
আমি কি এখনো আমি আছি?
নাকি ওই মেয়েটা
আমার চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখছে?

‘আমাদের বাচ্চাটা হয়েছে?’
এই প্রশ্নটা করতে গিয়েও ভয় লাগে,
কারণ যদি সে মেয়ে হয়,
আমি জানি না তাকে কোন পৃথিবীর গল্প শোনাবো।

আমি একটা মেয়ে চেয়েছিলাম খোদার কাছে,
ছোট ছোট হাতগুলো দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরবে,
লাল রঙের এই দুনিয়ায় সবুজ হয়ে ছুটবে।

কিন্তু এখন যাদের দেখি,
তারা জন্মানোর আগে একবার মরে,
শুধু দেহটা মরে পরে।

তোমার মুখটা ভুলে গেছি,
অভিমান করো না নিলু।

তোমার মুখ মনে করতে গেলে
মাথার ভেতর যে কি এক অসহ্য যন্ত্রণা!
যেন কেউ ভাঙা কাঁচ
মস্তিষ্কের ভেতর ঘষতেছে ধীরে ধীরে।

তোমার চোখ মনে করতে চাই,
কিন্তু দেখি
কার যেন চোখহীন মুখগুলো
আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।

আমি বুঝতে পারি,
আমি স্মৃতি হারাচ্ছি না,
আমি মানুষ হারাচ্ছি।

আম্মা কি এখনো কাঁদে?
নাকি কান্নাটাও একসময় শেষ হয়ে যায়?
একটা মানুষের চোখে আর কত পানি থাকে!

তুমি তারে বলবে,
আমি ভালো আছি।

কারণ সত্যটা বললে
তার বুকের ভেতরে
আরেকটা যুদ্ধ শুরু হবে।

আব্বার কবরটা মনে পড়ে,
কি যে শান্তিতে তার প্রাণ!

মনে হয়,
মাটির নিচে যারা
তারা সবাই ভাগ্যবান।

গতরাতে স্বপ্নে আব্বারে দেখলাম।
তিনি কিছু বলেন নাই,
শুধু স্থির হয়ে তাকিয়ে ছিলেন।

ঘুম ভাঙার পর বুঝলাম,
ওই চাহনিটাও
একচোখা রাক্ষুসী মেয়েটার।

নিলু,
আমার বন্ধুরা কেউ বেঁচে নেই।

মজার কথা জানো?
তাদের লাশও নাই।

এই যুদ্ধ মানুষকে শুধু মারে না,
মুছে ফেলে।

বাড়ির বিলটা কি তবে একা পড়ে থাকে?
সুগন্ধা নদীটা কি তবে একা একাই বয়?
ক্ষেতটা কি তবে একা একাই সবুজ হয়?

কেউ নামে না,
কেউ বসে না,
কেউ ফিরে না,
এ আমি জানি।

মনে হয়,
আমার আপন ভিটাও ভুলে যাচ্ছে
যে আমিও মিশে ছিলাম কোনোদিন।

তুমি ওই নীল শাড়িটা রেখে দিও,
যদিও জানি,
আমি তোমাকে চিনতে পারবো না।

কারণ তুমি এখন আর স্মৃতি না,
একটা অসুখ।
যা মাঝে মাঝে জেগে ওঠে,
তারপর আবার নিঃশব্দে মরে যায়।

এখানে মানুষ মরে না,
ধীরে ধীরে গলে যায়।

প্রথমে নাম ঝরে পড়ে,
তারপর মুখ খুলে পড়ে,
তারপর ভেতরটা পচে যায়।

শেষে শুধু একটা গন্ধ থাকে,
যা বাতাসে ভাসে,
আর জীবিতরা সেই গন্ধে মাতাল হয়।

নিলু, জানো,
আজ আমি একটা অদ্ভুত সূর্য দেখেছি।

সূর্যের আলোটা অনেক নিষ্ঠুর।
সূর্যটা ওঠার সাথে সাথেই
মানুষের ছায়াগুলো মাটিতে পুড়ে আটকে যায়।

আমি তার নাম দিয়েছি
‘আজরাইলের থাবা’।

এই আলোতে
শরীর গলে পড়ে।

কিন্তু ছায়া বেঁচে থাকে,
মাটির সাথে গেঁথে যায়, চিরতরে।

নিলু,
আমি এখন আয়নায় তাকাই না।

কারণ আমি জানি,
আমি যাকে দেখবো,
সে আমি না।

সে হয়তো ওই মেয়েটা,
নয়তো কোনো নামহীন মৃত মানুষ,
যে আমার ভেতরে বাসা বেঁধেছে।

যদি আমি ফিরে না আসি,
এইটা ভেবে কষ্ট পাই না।

কষ্ট পাই এইটা ভেবে,
আমি যদি ফিরেও আসি,
আমি কি আগের আমি থাকবো?

আমার মেয়েকে বলবে,

তার বাবা যুদ্ধ করতে গিয়ে
মরে যায়নি।

সে হারিয়ে গেছে,

মানুষের ভেতরের মানুষটাকে
খুঁজতে গিয়ে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
Piupa Santra অপূর্ব.. অসাধারণ????✊????মুগ্ধ হলাম ????????
সাদিয়া আক্তার রিমি অন্যরকম তবে সুন্দর
সাইদ খোকন নাজিরী অনেক সুন্দর ভাবনা।অনেক সুন্দর হয়েছে আপনার লেখা।

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

এটি একটি সৈনিকের লেখা চিঠি। এই একটিমাত্র চিঠির ভেতর ধ্বংসের প্রতিটি স্তরে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে যুদ্ধের ভয়াবহতা কেবল বোমা-গোলায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা মানুষের স্মৃতি, ভালোবাসা ও অস্তিত্বকেই গ্রাস করে। আধুনিক যুগে এই একমুখী চিঠি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের যোগাযোগহীনতাকে নির্দেশ করে।

০৪ ডিসেম্বর - ২০১৭ গল্প/কবিতা: ৭ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "বাবা”
কবিতার বিষয় "বাবা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ মে,২০২৬